পবিত্র জশনে জুলেছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী ﷺ ও এর প্রবর্তন।


যুগে যুগে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর ওয়াহাদানিয়্যত মানুষের মাঝে প্রচার-প্রসারের জন্য অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। যাঁর জন্য তিনি সমস্ত কুল মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন, নবীকুল সরদার রহমাতুল্লিল আলামিন হযরতে আহমদ মুস্তাফা মুহাম্মদ মুজতবা ﷺ কে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে হযরত বাবা আব্দুল্লাহ ও মা আমেনার নসল দিয়ে তাঁর প্রতিনিধি খাতেমুল আম্বিয়া তথা সর্বশেষ নবী হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর মর্যাদা দিয়েএই পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। তাঁর আগমন ছিল সমগ্র মানব জাতীর জন্য রহমত স্বরূপ! সে সম্পর্কে অবহিত করে মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, "হে হাবীব! আমি  আপনাকে সমগ্র  জগতের রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।" (সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং ১০৭) সৃষ্টির সেরা নবীর আগমনের সুসংবাদে যে আঙ্গুলের ইশারায় আবু জাহেল গোলাম আজাদ করেছিলেন, সে আঙ্গুল হতে এখনো আবু জাহেলের মত নাফরমানও রহমত প্রাপ্ত হচ্ছে।(মাওয়াহিবে লাদুনিয়া ১ম জিল্দ ২৭ পৃঃ, জারকানী ১ম জিল্দ ১৩৭ পৃঃ) হযুর ﷺ'র আগমন মুমিনদের জন্য যে শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, এতে বিন্দু পরিমাণও সন্দেহের অবকাশ নেই। তাইতো বিশ্বের নবী প্রেমিক আশেকে রাসুলগণ এই মহান নিয়ামতকে স্বরণ করতে ১২ রবিউল আউয়াল উদযাপন করেন, পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী ﷺ- প্রিয় নবীর শুভাগমনকে কেন্দ্র করে খুশি উদযাপন করা এটা আজকের নয়, চৌদ্দশত বছর ধরে সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে সমস্ত মুমিনগণ যুগে যুগে বিভিন্নভাবে উদযাপন করে আসছেন। কেননা, এটি আল্লাহর নির্দেশ। যেমনঃ এরশাদ হচ্ছে, "হে হাবীব! আপনি বলুন, আল্লাহর দয়া এবং রহমতকে কেন্দ্র করে তারা যেন আনন্দ উদযাপন করে এবং এটাই হবে তাদের অর্জিত সব কর্মফল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।"(সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৬৪) এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এখানে আল্লাহর “অনুগ্রহ” দ্বারা ইলমে দ্বীন এবং “রহমত” দ্বারা নবী কারীম ﷺ এর কথা বুঝানো হয়েছে।( আদ্দুররুল মনসূর পৃঃ ৩৩০; তাফসীর রুহুলমা’আনী ১১তম খন্ড, পৃঃ ১৮৩) সুতরাং আলোচ্য আয়াত এবং তাফসীরের মাধ্যমে বুঝা গেল, মিলাদুন্নাবী বা রাসূল ﷺ এর দুনিয়ায় শুভাগমনের কারণে স্বয়ং আল্লাহ পাক নিজে আমাদের আনন্দ উৎসব করার আদেশ দিয়েছেন। আর মিলাদুন্নাবী বা রাসূল ﷺ এর আগমন উপলক্ষে আনন্দ-উৎসব বা খুশী উদযাপন করার নামই হল পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নাবী ﷺ। ১২ রবিউল আউয়াল মুমিনদের জন্য আনন্দের দিন হলেও রহমাতুল্লিল আলামিনের আগনে শয়তান কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তাফসিরে ইবনে কাসিরে উল্ল্যেখ আছে, চারবার শয়তান চিৎকার করে কেঁদেছিল, ১.যখন আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত হিসেবে ঘোষণা দিলেন, ২. যখন তাকে বেহেস্ত থেকে বিতাড়িত করা হল ৩.মুক্তির দিশারী রাসুলে পাক ﷺُ দুনিয়াতে আগমনের সময় এবং ৪.সূরা ফাতিহা নাযিল হবার সময়। (ইবন কাসির, আল আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া,২য় খন্ড,পৃষ্ঠা - ১৬৬) কারণ শয়তান জানত হুযুর পাক ﷺُ হলেন, মুক্তির দূত, গুনাগার উম্মতের পারকান্ডারী আর তাঁর ভালোবাসাই ঈমান তাই সে মানুষকে রাসুল ﷺُ'র প্রেম থেকে দুরে নেওয়ার জন্য তার অনুচর ওহাবী, মৌদুদীবাদ ও মুনাফিকদের দ্বারা নানা কৌশলে মুসলমানদের ভিতর ছড়িয়ে দেয় নবী বিদ্ধেষ এবং এসব মুনাফিকরা তাদের কিতাবে কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যখ্যা দিয়ে নবী-রাসুল, আউলিয়াদের শানে কটুক্তি করতে থাকে। যখন তাদের প্রোচনায় সরল প্রাণ মুসলমানগন ঈমানের মূল হুব্বে রাসুল হতে দুরে সরে প্রথভ্রষ্টতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, সে মূহুর্তে বিপদগামী মানুষদের সঠিক দিশা দিতে মুজাদ্দিদে মিল্লাত ইমামে ইশকে মহব্বত আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খাঁন ফাজেলে ব্রেলভী (রঃ) তীক্ষ্ণধার লেখনি দ্বারা ওহাবীবাদের অপব্যাখ্যার জবাব দিয়ে শয়তানী পথ হতে মানুষকে রক্ষা করে শিক্ষা দেন নবীপ্রেমের বন্দনা। তারই ধারাবাহিকতায় নবীপ্রেমকে মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে দিয়ে সুদূরপ্রসারী মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে এককাতারে আবদ্ধ করতে ১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে বেলাদতে মুস্তাফা কে বরণ করে নিতে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩৪০ হিজরির দিকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশস্থ হাজারা জেলার দরবারে আলীয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরীফে কুতুবুল আউলিয়া আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রহঃ) ও সৈয়্যদা খাতুন (রহঃ)'র ঘরে জন্ম নেওয়া, গাউসে দাঁওরা হযরত খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী (রহঃ)'র ভবিষ্যৎ বাণীর ফসল, মাতৃগর্ভের অলী, গাউসে জমান, রাসুল ﷺُ'র ৩৮তম আওলাদ, হযরতুলহাজ্ব, আল্লামা হাফেজ, ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রঃ) সিরিকোট হতে আনজুমান-এ রহমানিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের ১৯৭৪ সালে চিঠি মারেফাত এক ঐতিহাসিক নির্দেশ প্রদান করেন যে, পবিত্র জশনে জুলুছে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উদযাপনের। জশনে জুলুছ কি ও কিভাবে পালন করা হবে এ বিষয় সম্পর্কে সকল রূপরেখা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও তিনি চিঠি দ্বারা জানিয়ে দিয়েন। উল্ল্যেখ্য, জশনে জুলুছ শব্দের বাংলা অর্থ হলো বর্ণাট্য শোভাযাত্রা বা স্বাগত মিছিল, ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর শুভাগমন উপলক্ষে খুশি উদযাপন করা সুতারাং হুযুর পাক ﷺ'র আগমন উপলক্ষে ১২ রবিউল আউয়াল যে বর্ণাট্য আনন্দ মিছিল বের হয় তাই পবিত্র জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নী ﷺ- তাঁর এই নির্দেশনা অনুসারে একই বছর ১৯৭৪ সালে হুজুর কেবলার স্মৃতিধন্য চট্টগ্রাম কোরবানীগঞ্জ বলুয়ারদীঘি পাড়স্থ খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া হতে তাঁর খলিফায়ে আজম আলহাজ্ব নুর মুহাম্মদ সওদাগর আল কাদেরী (রহঃ) নৈতৃত্বে পবিত্র জশনে জুলুছ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া ময়দানে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ মাহফিলে সমবেত হয়ে সেদিন চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশে নবীপ্রেমের নতুন বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। পর্বর্তী বছর ১৯৭৫ সালে হুজুর কেবলার আরেক খলিফা আলহাজ্ব আমিনুর রহমান সওদাগর আল কাদেরী (রহঃ)'র নৈতৃত্বে জশনে জুলুস বের হয়। ১৯৭৬-১৯৮৬ পর্যন্ত হুজুর কেবলা নিজেই জুলুছে সদারত করেছিলেন। (সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রঃ)'র জীবনী গ্রন্থ, পৃঃ৮২ কৃতঃ সৈয়্যদ মুহাম্মদ অসিয়র রহমান মুঃ) ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন মোতাবেক ১৫ জিলহজ্ব ১৪১৩ হিজরিতে হুযুর কেবলা (রহঃ) ওফাত লাভ করেন, তার পূর্বেই খেলাফতের স্থলাভিষিক্ত করে যান তাঁরই সুযোগ্য পুত্রদ্বয় গাউসে জমান, মুর্শিদে বরহক, হযরতুলহাজ্ব আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মুঃ) ও পীরে বাঙাল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ ছাবের শাহ (মুঃ) কে। বর্তমানে হুজুর কেবলাদ্বয়ের সদারতে চট্টগ্রামের জমিনে বিশ্বের বৃহত্তম জশনে জুলেছে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার তথ্য মতে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়।অনুরূপভাবে জশনে জুলুছের এই অপরূপ উচ্ছাস ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। বাতিলদের বিরোধীতার পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সুন্নী মাশায়েখগণ এর প্রতি আগ্রহ না দেখালেও বর্তমানে এর বাস্তব প্রেক্ষাপট উপলদ্ধি করে প্রায় প্রতিটা সুন্নী মাশায়েখ ও দরবারের পক্ষ হতে জশনে জুলুস বের করে থাকেন। কালক্রমে এটি দিনদিন সর্বজনস্বীকৃত হয়ে ইসলামী সংস্কৃতির পূনর্জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নী ﷺ বিরোধী ষড়যন্ত্র যখন বিশ্ব সুন্নী মুসলিমদের অস্তিত্বকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল- তখন ঈমানের মূল উৎস নবীপ্রেম সকলের ধারে ধারে পৌছিয়ে দিয়ে ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙ্গা জবাব হিসেবে ‘জশনে জুলুছ’ হয়েছে বিশ্ব সুন্নীয়ত ঐক্যের প্রতিক ও সুদূরপ্রসারী শতাব্দির শ্রেষ্ঠ সংস্কার। এ কৃতিত্বের একমাত্র দাবীদার শতাব্দির শ্রেষ্ঠ সংস্কারক, গাউসে জমান আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রহঃ)। অনেকেই জশনে জুলুছের প্রচলন আগে থেকে ছিল এ কথা বলে গাউসে জমানের কৃতিত্ব স্বীকার করতে চাই না। তাদের জেনে রাখা উচিৎ যে, গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) যেভাবে মুমূর্ষু দ্বীনকে জীবন দান করে মহিউদ্দিন হয়েছেন অনুরূপভাবে গাউসে জমান তৈয়্যব শাহ (রহঃ) ইসলামী সংস্কৃতির পূনর্জীবন দান করে দ্বীন সংস্কারে অবদান রেখেছেন । হে মহান সৃষ্টিকুল শিরোমনীর স্রষ্টা! এই মহান সংস্কারককে উচু মকাম দান করুন আর তাঁর উসিলায় আমাদেরও কবুল করুন। আমিন, বেহুরমাতি সাইয়্যেদুল মুরসালিন। #সহায়ক_উৎসঃ www.anjumantrust.org ණমুহাম্মদ তাহের হোসাইন #শিক্ষার্থীঃ জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া

https://www.facebook.com/ttaherh21