সূদের অবৈধতা ,ব্যবসা এবং সুদের মধ্যে পার্থক্য ।


‘‘সুদ (পাপের দিক থেকে) ৭০ প্রকার। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট (পাপের) সুদ হল মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করা! (অর্থাৎ সুদ খাওয়ার

 

আল্লাহ তাআলা সুদকে সর্বতোভাবে কঠোররূপে হারাম গণ্য করেছেন এবং সুদখোরদের বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর রসূলের তরফ থেকে যুদ্ধ ঘোষণা করে মানবজাতিকে ভীতিপ্রদর্শন করেছেন।

তিনি বলেন:

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (278) فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لا تَظْلِمُونَ وَلا تُظْلَمُونَ﴾

অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং (লোকদের নিকট) তোমাদের সুদের যা বকেয়া আছে, তা ছেড়ে দাও--- যদি তোমরা ঈমানদার হও। আর যদি তোমরা এরূপ না কর (সুদ না ছাড়) তবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের তরফ থেকে যুদ্ধ ঘোষণা কবুল করে নাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা কারো উপর অত্যাচার করবে না এবং নিজেরাও অত্যাচারিত হবে না।[1]

আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত; নবী করীম (সাঃ) বলেছেন,

الربا سبعون جزءا أيسرها أن ينكح الرجل أمه.

‘‘সুদ (পাপের দিক থেকে) ৭০ প্রকার। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট (পাপের) সুদ হল মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করা! (অর্থাৎ সুদ খাওয়ার গোনাহ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার চেয়ে ৭০ গুণ বেশী।)[2]

ফিরিশতার হাতে গোসল লাভকারী সাহাবী হানযালার পুত্র আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন,

درهم ربا يأكله الرجل وهو يعلم أشد عند الله من ستة وثلاثين زنية.

অর্থাৎ ‘‘জেনে শুনে এক দিরহাম পরিমাণ সুদ খাওয়ার গোনাহ আল্লাহর নিকট ৩৬ বার ব্যভিচার করার চেয়েও বড়।’’[3]

জাহেলিয়াতের সুদ

এবারে আসুন, আমরা দেখি, জাহেলিয়াতের সুদ কেমন ছিল; যে সুদের অবৈধতার উপর কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এবং যে ব্যাপারে নবী (সাঃ) এর রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

 জাহেলিয়াতের যুগে কারবারের যে পদ্ধতিকে ‘রিবা’ বা সুদ বলা হত তার বিভিন্ন ধরন একাধিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।

 কারবারের একটি ধরন এরূপ ছিল;

হযরত কাতাদাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘জাহেলিয়াত যুগের সুদ ছিল এই যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে কোন মাল বিক্রয় করত এবং দাম মিটাবার জন্য একটি সময় নির্ধারিত করত। এবারে সেই নির্দিষ্ট সময় ও মেয়াদ পূরণ হওয়ার পর যদি ক্রেতার নিকট দাম মিটাবার মত অর্থ না হত, তাহলে বিক্রেতা তার (ক্রেতার) উপর অতিরিক্ত অর্থ চাপিয়ে দিত এবং (দাম মিটাবার) সময় আরো বাড়িয়ে দিত।’[1]

মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘জাহেলিয়াতের সুদ এই ছিল যে, এক ব্যক্তি কারো নিকট ঋণ করত এবং বলত, যদি তুমি আমাকে ঋণ পরিশোধে এতটা সময় দাও, তাহলে আমি তোমাকে এত এত বেশী দেব।’[2]

আবু বাকার জাসসাস (রাহিমাহুল্লাহ)-এর প্রতিপাদন অনুসারে জাহেলিয়াত যুগের প্রচলিত সুদ ছিল এই যে, ‘তারা একে অন্যের নিকট ঋণ গ্রহণ করত এবং আপোসে এই চুক্তি করে নিত যে, এত সময় (ঋণ রাখলে) আসল ছাড়া আরো এত টাকা বাড়তি আদায় করতে হবে।’ (আহকামুল কুরআন, ১ম খন্ড)

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর প্রতিপাদন মতে, জাহেলিয়াত যুগের লোকেদের মধ্যে এই রীতি ছিল যে, ‘এক ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা ধার দিত, অতঃপর সে তার (ঋণগ্রহীতার) নিকট থেকে মাসিক হারে সুদ হিসাবে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ওসুল করত। এর পর যখন ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়কাল শেষ হয়ে যেত, তখন ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আসল টাকা চাওয়া হত। সে সময় পরিশোধ করতে না পারলে তাকে পুনরায় অতিরিক্ত সময় অবকাশ দেওয়া হত এবং সেই সঙ্গে সুদের পরিমাণও দেওয়া হত বাড়িয়ে। (তফসীরে কাবীর ২/৩৫১)

উপরে উল্লিখিত সুদের সংজ্ঞার্থ এবং জাহেলিয়াত যুগের প্রচলিত সুদী কারবার নিয়ে যদি একটু চিন্তা-ভাবনা করেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে, বর্তমান যুগে ব্যাংকসমূহে যে সুদী কারবার চলছে, তা হুবহু জাহেলিয়াত যুগে প্রচলিত সুদী কারবার সমূহের অন্যতম; যার অবৈধতার ব্যাপারে সারা মুসলিম উম্মাহ একমত।[3]

 জাহেলিয়াত যুগে উক্ত প্রকার সুদী কারবার প্রচলিত ছিল। যাকে আরববাসিগণ সুদ বলত। সেই কারবারকেই কুরআন মাজীদে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তারা উক্ত সুদী কারবারকে ব্যবসার মত বৈধ ও জায়েয মনে করত; যেমন বর্তমান জাহেলিয়াত যুগেও তাই মনে করা হয়।

 ইসলাম আমাদেরকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে, ব্যবসার ফলে মূলধনে যে অতিরিক্ত অর্থ বৃদ্ধি পায় সেই অর্থ এ অর্থ থেকে ভিন্নতর যা সূদী কারবারে বৃদ্ধি পায়। প্রথম প্রকার অতিরিক্ত অর্থ হালাল। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার অতিরিক্ত অর্থ হারাম।

আল্লাহ তাআলা জাহেলিয়াত যুগের এ লোকদের ধারণাকে খন্ডন করে বলেন:

﴿ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبا وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبا ﴾

অর্থাৎ তা এই জন্য যে, তারা বলে ব্যবসা তো সুদের মতই। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। (সূরা বাক্বারাহ ২৭৫ আয়াত) এ ব্যাপারে মুসলিমের জন্য আবশ্যক এই যে, সে ব্যবসা এবং সুদী কারবারের মধ্যে পার্থক্য জানবে, সুদের বৈশিষ্ট্য চিনবে এবং তার সর্বনাশিতার ব্যাপারে সম্যক্ জ্ঞান লাভ করবে। তাহলেই সে জানতে পারবে, ইসলাম কোন্ ভিত্তিতে তা হারাম নিরূপণ করেছে।

ব্যবসা এবং সুদের মধ্যে পার্থক্য

ব্যবসা বা ক্রয়-বিক্রয় এই যে, বিক্রেতা কোন জিনিসকে বিক্রয় করার জন্য পেশ করে। বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝে সেই জিনিসের দাম কত তা নির্দিষ্ট ও নিষ্পত্তি হয়। অতঃপর সেই দাম বা মূল্যের বিনিময়ে ক্রেতা সেই জিনিসটাকে বিক্রেতার নিকট থেকে গ্রহণ করে।

 পক্ষান্তরে সুদ এই যে, কোন ব্যক্তি তার মূলধন কোন অপর এক ব্যক্তিকে ধার দেয় এবং এই শর্ত আরোপ করে যে, ‘এত সময়ের মধ্যে আসলের উপর এত টাকা বেশী নেব।’ আসল টাকা ছাড়া এ বাড়তি টাকার নামই হল সুদ। যা কোন জিনিসের মূল্য নয় বরং তা হল কেবল (ঋণ গ্রহীতাকে তার ঋণ পরিশোধে) কিছু সময় ও অবকাশ দেওয়ার বিনিময়।

 অতএব ব্যবসা এবং সুদ এই উভয় প্রকার লেন-দেন নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনার পর নিম্নোক্ত পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়ঃ-

১- ব্যবসায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই মুনাফা বিনিময় সমানভাবে হয়ে থাকে; কারণ ক্রেতা এ ক্রীত বস্ত্ত বিক্রেতার নিকট থেকে ক্রয় করে তার দ্বারা উপকৃত হয়। এবং বিক্রেতাও তার সেই শ্রম, বুদ্ধি এবং সময়ের মূল্য গ্রহণ করে; যা সে ক্রেতার জন্য এ জিনিস প্রস্ত্তত ও সরবরাহ করার পথে ব্যয় করেছে।

 পক্ষান্তরে সুদী কারবারে দুই পক্ষের মুনাফা বিনিময় সমানভাবে হয় না। সুদগ্রহীতা তো এক নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ নিয়ে নেয়; ফলে সে নিশ্চিতরূপে উপকৃত হয়। কিন্তু সুদদাতার জন্য কেবল (ঋণ পরিশোধে) অবকাশ মিলে; যাতে সে উপকৃত হয় কি না তা অনিশ্চিত। কারণ ঋণ গ্রহীতা যদি ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা অভাব মিটাবার উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করে থাকে তবে নিঃসন্দেহে এ অবকাশ অপকারী। আর যদি সে ব্যবসা করার জন্য নিয়ে থাকে, তাহলে অবকাশে যেমন তার উপকার বা লাভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে তেমনি আছে অপকার বা ক্ষতি হওয়ারও আশঙ্কা। কিন্তু ঋণদাতা সর্বাবস্থায় তার মুনাফার (সুদের) একটা নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করে থাকে; তাতে ঋণগ্রহীতার কারবারে লাভ হোক চাই না হোক। সুতরাং এ কথা স্পষ্ট হল যে, সুদী কারবার কেবল একপক্ষের লাভ এবং অপর পক্ষের ক্ষতি, অথবা একপক্ষের নিশ্চিত ও নির্দিষ্ট লাভ এবং অপর পক্ষের অনিশ্চিত ও অনির্দিষ্ট লাভের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

 ২- ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসার ক্ষেত্রে বিক্রেতা ক্রেতার নিকট থেকে যত পরিমাণেই লাভ গ্রহণ করুক না কেন, গ্রহণ করে সে মাত্র একবার। পক্ষান্তরে সুদী কারবারে অর্থ লগ্নিকারী তার অর্থের উপর ধারাবাহিকভাবে বারংবার মুনাফা বা সূদ গ্রহণ করতে থাকে এবং সময়ের গতি (লমবা হয়ে) বাড়ার সাথে সাথে তার সুদের অঙ্কও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ঋণগ্রহীতা এ অর্থ দ্বারা যতই উপকৃত হোক না কেন, তার এ উপকার এক নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কিন্তু এর বিপরীত পক্ষে ঋণদাতা যে উপকার ও লাভ অর্জন করে থাকে, তার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই।

 ৩- ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসায় পণ্য-দ্রব্য ও তার মূল্য বিনিময় হওয়ার সাথে সাথেই আদান-প্রদানের ব্যাপার শেষ হয়ে যায়। এর পরে ক্রেতা স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করে এবং বিক্রেতাকে কোন জিনিস ফেরৎ দিতে (বা নতুন ভাবে দিতে) হয় না। পক্ষান্তরে সুদী কারবারে ঋণগ্রহীতা টাকা নিয়ে খরচ করে ফেলে। অতঃপর সেই খরচ-করা টাকা যোগাড় করে বাড়তি সুদ-সহ ফেরৎ দিতে হয়।

 ৪- ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে মানুষ নিজের মেহনত ও বুদ্ধি ব্যয় করে এবং তারই পারিশ্রমিক গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে সুদী কারবারে সুদখোর কেবলমাত্র তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল দিয়ে বিনা মেহনত ও কষ্টে অপরের কামাই ও উপার্জনে অংশীদার হয়ে বসে।

 এছাড়া সুদ মানুষের মাঝে কার্পণ্য, স্বার্থপরতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, নির্দয়তা, অর্থলোলুপতা ও ধনপূজার মত প্রভৃতি গুণ সৃষ্টি করে। দুই জাতির মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ আনয়ন করে। জাতির ব্যক্তিবর্গের মাঝে সহানুভূতি ও পরস্পরকে সহায়তা করার নৈতিক সম্পর্ক নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। সমাজের ধন-দৌলতের স্বাধীন আবর্তনকে ব্যাহত করে, বরং এ ধন-সম্পদের গতিমুখ নির্ধনদের নিকট থেকে ধনপতিদের দিকে ফিরিয়ে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে জনসাধারণের মালধন গুটিয়ে কেবল একশ্রেণীর নিকট গিয়ে একত্রিত ও স্ত্তপীকৃত হতে থাকে। পরিশেষে তা পুরো সমাজেরই ধ্বংস ও বরবাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এসব তিক্ত-অভিজ্ঞতার কথা জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি বিষয়ে দূরদর্শীদের নিকট অবশ্যই অবিদিত নয়। সুদের এ সকল মন্দ প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নিশ্চয়ই অনস্বীকার্য।

133 Views